প্রকাশিত: ৩ মে, ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

৫০০ টাকার জন্যে বৃদ্ধাকে হত্যা

ছবি: সংগ্রীহিত

৫০০ টাকার জন্যে বৃদ্ধাকে হত্যা

মাত্র ৫০০ টাকার পাওনার জেরে ময়মনসিংহে ঘটে গেছে এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। যে তরুণকে নিজের নাতির মতো স্নেহ করতেন বৃদ্ধা নূরজাহান (৬০), সেই পরিচিত ছেলের হাতেই শেষ হয়েছে তার জীবন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিহত নূরজাহান (৬০) ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার মীরকান্দাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নিজ বাড়ির রান্নাঘরের পাশে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরদিন তার মেয়ে নূরুন্নাহার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে পিবিআই ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের একটি বিশেষ টিম গত ২ মে ভোররাত ৪টা ১৫ মিনিটে কোতোয়ালী থানার শম্ভুগঞ্জ এলাকা থেকে মামলার মূল আসামি মোঃ রনি মিয়া (২৬)-কে গ্রেফতার করে। সে একই এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি।

ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে বলা হয়, গত ৩০ জানুয়ারি গভীর রাতে ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালী থানার মীরকান্দাপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির রান্নাঘরের পাশে খড়ের নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায় নূরজাহানের নিথর দেহ। দুই দিন ধরে খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশে খবর দেয়। এ ঘটনায় এলাকায় সৃষ্টি হয় চাঞ্চল্য।

নিহতের মেয়ে নূরুন্নাহার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই ময়মনসিংহ জেলা। শুরু হয় প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর অনুসন্ধান।

অবশেষে গত ২ মে ভোররাতে শম্ভুগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় মূল আসামি মোঃ রনি মিয়া (২৬)-কে। পেশায় ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি রনি একই গ্রামের বাসিন্দা এবং নিহত নূরজাহানকে ‘নানী’ বলে ডাকত। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নূরজাহান একাই বসবাস করতেন এবং আশপাশের অনেকেই তার কাছে আসা-যাওয়া করত, যার মধ্যে রনিও ছিল নিয়মিত।

তদন্তে উঠে এসেছে এক শীতল বাস্তবতা। পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে রনি মিয়া নূরজাহানের কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নেয়। কিন্তু সেই সামান্য টাকাই হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী দ্বন্দ্বের কারণ। ঘটনার দিন রাতে রনি নূরজাহানের বাড়িতে যায়। প্রথমে স্বাভাবিক আলাপচারিতা চললেও একপর্যায়ে নূরজাহান তার পাওনা টাকা ফেরত চান। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক শুরু হয়।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন নূরজাহান রনির ব্যক্তিগত কিছু আচরণ— বিশেষ করে মেয়েদের নিয়ে তার বাড়িতে আসা—পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে রনি। সুযোগ বুঝে রান্নাঘরের মসলা বাটার শিল দিয়ে নূরজাহানের মাথায় আঘাত করে। বৃদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত করতে একাধিকবার আঘাত করা হয়। এরপর মরদেহ খড় দিয়ে ঢেকে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সে।

পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে রনি হত্যার দায় স্বীকার করে এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। তার কাছ থেকে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।

এই ঘটনার মাধ্যমে উঠে এসেছে সমাজের এক নির্মম চিত্র—যেখানে বিশ্বাস, স্নেহ আর মানবিক সম্পর্কও কখনো কখনো ভেঙে পড়ে লোভ, ভয় কিংবা ক্ষণিকের ক্রোধের কাছে। ‘নানী’ ডাকা সেই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি একজন বৃদ্ধার জীবন।

পিবিআই ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, “মাত্র ৫০০ টাকার জন্য একজন বৃদ্ধাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। হত্যার পর আসামি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিল। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা দ্রুত তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।”

বর্তমানে আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়—এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক গভীর সতর্কবার্তা।

মন্তব্য করুন