প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০২:৩৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে ইরান ফুটবল দলের সংবাদ সম্মেলন শুধু ফুটবলকেন্দ্রিক ছিল না। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে কোচ আমির গালেনোই ও দলের তারকা ফরোয়ার্ড Mehdi Taremi-এর কথায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রবাসী ইরানিদের প্রতিবাদ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং জাতীয় দলের ওপর বাড়তি চাপ। তবে সবকিছুর মধ্যেও তাদের বার্তা ছিল একটাই—ইরান দল খেলতে চায় বিশ্বের সব ইরানির জন্য।
লস অ্যাঞ্জেলেসে গ্রুপ ‘জি’র প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ইরান। কিন্তু ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না শুধুই ফুটবল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, প্রবাসী ইরানিদের বিক্ষোভ এবং বিশ্বকাপ ঘিরে রাজনৈতিক আবহ ইরানের প্রস্তুতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তারেমি বলেন, দেশের ভেতরে থাকা ইরানিদের মতো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী প্রবাসী ইরানিরাও তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরে ইরান একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই ঐক্যের প্রতিফলন ঘটাতে চায় দল।
তারেমির বক্তব্যে ছিল আবেগের ছোঁয়া। তিনি জানান, ইরান দল বিশ্বকাপে এসেছে মানুষকে আনন্দ দিতে—তারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক না কেন। মাঠের বাইরের রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও ফুটবলাররা নিজেদের দেশের মানুষের জন্যই খেলতে চান।
একই সুরে কথা বলেছেন কোচ Amir Ghalenoei। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতিকে সুযোগে পরিণত করার মানসিকতা ইরানিদের দীর্ঘদিনের। দলের লক্ষ্য একটাই—মানুষকে আনন্দ দেওয়া। বাকি সবকিছু আল্লাহর হাতে।
তবে এবারের বিশ্বকাপ ইরানের জন্য মোটেও স্বাভাবিক নয়। সাধারণত বিশ্বকাপ মানেই উৎসবের আবহ, কিন্তু ইরান দলকে মাঠে নামতে হচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের মধ্যে। লস অ্যাঞ্জেলেসে ম্যাচ ঘিরে আগেই প্রতিবাদের আশঙ্কা ছিল, কারণ শহরটিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস।
প্রবাসী ইরানিদের একটি অংশ বর্তমান সরকারের মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে ক্ষুব্ধ। তারা স্টেডিয়ামের বাইরে প্রতিবাদ করেছে এবং ম্যাচের দিনও বিক্ষোভের সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকার ফুটবলকে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে অনেক প্রবাসী ইরানি জাতীয় দলকে সমর্থন জানাচ্ছেন, কারণ তাদের কাছে দলটি দেশের মানুষের আবেগ ও পরিচয়ের প্রতীক।
এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে ইরান দল। একদিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব, অন্যদিকে সেই দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা। তাই তারেমি ও গালেনোই সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে না গিয়ে বারবার ‘সব ইরানি’ শব্দটির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
মাঠের বাইরের চ্যালেঞ্জও কম নয়। দলকে যুক্তরাষ্ট্রে পুরো সময় অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে ম্যাচের মধ্যবর্তী সময়ে তাদের বেস ক্যাম্প রাখতে হচ্ছে মেক্সিকোতে। এছাড়া কয়েকজন স্টাফ ভিসা জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। এতে যাতায়াত, নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফুটবলীয় দিক থেকেও ইরানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। দলটি এখনো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারেনি। এবার তাদের গ্রুপে রয়েছে নিউজিল্যান্ড, মিসর ও বেলজিয়াম। শক্তির বিচারে বেলজিয়ামকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে, তাই প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইতিবাচক ফল পাওয়া ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দলের আরেকটি বড় ধাক্কা হলো Sardar Azmoun-এর অনুপস্থিতি। জাতীয় দলের হয়ে ৯১ ম্যাচে ৫৭ গোল করা এই ফরোয়ার্ড চূড়ান্ত দলে নেই। ফলে আক্রমণভাগে নেতৃত্বের দায়িত্ব আরও বেশি করে এসে পড়েছে তারেমির কাঁধে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারবিরোধী স্লোগান বা প্রাক্-বিপ্লবী ইরানের পতাকা প্রদর্শন হলে দল কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে—এমন প্রশ্নও করা হয় গালেনোইকে। তিনি সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, তাঁর খেলোয়াড়েরা মনোযোগ বিচ্যুত করার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষা করতে জানে।
এই উত্তরই যেন ইরান দলের বর্তমান অবস্থানকে স্পষ্ট করে। তারা বিতর্কে জড়াতে চায় না, চায় মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে। তবে বাস্তবতা হলো, এই বিশ্বকাপে ইরানের পক্ষে মাঠের বাইরের ঘটনাগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা কঠিন।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়। এটি ইরানের জন্য রাজনৈতিক চাপ, বিভক্ত সমর্থকগোষ্ঠী এবং নানা বিতর্কের মাঝেও নিজেদের পরিচয় ও ঐক্যের বার্তা তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ।
মন্তব্য করুন