প্রকাশিত: ১৯ ঘন্টা আগে, ১০:৪৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জুলাই আন্দোলনকারীদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ষড়যন্ত্র চলছে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি
পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, “জুলাই আন্দোলনকারীদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ষড়যন্ত্র চলছে”। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনসভায় ঘোষণা দিয়েছেন জুলাই সনদ তাঁর সরকার অক্ষরে-অক্ষরে পালন করবে! তাহলে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ কেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা নিচ্ছে না প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, যখন সংসদের মতো পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচন না হয় এজন্য তারা জুলাই সনদে আপোষ করে স্বাক্ষর দিয়েছে তখন বুঝার বাকি থাকে না সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না। বরং তাঁরা জুলাই আন্দোলনকে অস্বীকার করে নতুন করে আবারও ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করছে।
সোমবার (৪ মে) দুপুরে বাউফল উপজেলা জামায়াত কার্যালয়ে জুলাই যোদ্ধাদের সাথে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি আরও বলেন, আপনারা আমাকে এমপির খোটা দেবেন না; এমপির চেয়ে আমার কাছে অনেক বড় মর্যাদা হচ্ছে—আমি আমার চতুর্থ সন্তানকে শহীদ হিসেবে পেয়েছি। দেশের জন্য তিনি (আমার চতুর্থ সন্তান) আল্লাহর কাছে শহীদ হয়েছেন। তাকে খিলগাঁওয়ে দাফন করা হয়েছে। কিন্তু আমার সন্তানের কবরটি আইডেন্টিফাই করতে দেওয়া হয়নি। আমাকে জানাজা পড়তে দেওয়া হয়নি। ঠিক আজকে জুলাইয়ের অনেক শহীদ আছেন, যাদের কবর কোথায় আমরা জানি না। একইভাবে আমি আমার সন্তানের কবর কোথায়, তা-ও জানি না। তিনি আরও বলেন, আমার শহীদ সন্তানের ছবি ছিল আমার স্ত্রীর ফোনে। সেই ফোনটি ভেঙে ফেলেছে আওয়ামী স্বৈরাচাররা। তখন তারা বলেছিল, আবেগে দেশ চলে না। এখনো কেউ কেউ বলে, আবেগে দেশ চলে না। আরে ভাই, আবেগের কারণেই আমরা ১৬ জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত নতুন বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করতে পেরেছি।
সাংসদ ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, আমি সংসদে প্রথমে ৭ মিনিট কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, পরে ৯ মিনিট কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। এই দুইবার—মোট ১৬ মিনিটে— প্রত্যেকটি মিনিট, প্রত্যেকটি সেকেন্ড আমি জুলাই শহীদদের এবং গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে কথা বলেছি। তিনি আরও বলেন, শুরুতে আমি একটি কথাও আমার এলাকা নিয়ে বলিনি। কারণ আমি জানি—দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, বগা সেতু যাই বলি না কেন, যদি গণভোটের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা না যায়, তাহলে কোনো শক্তিই এই রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তন করতে পারবে না। পরবর্তীতে আমি বাউফলবাসীর জন্য এয়ারপোর্ট চেয়েছি, আদালত চেয়েছি, হাসপাতাল চেয়েছি, মাদক নির্মূল চেয়েছি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট চেয়েছি। কিন্তু আমার মন কেন যেন বলে, এসব আমাদের যতটা না প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন গণভোট বাস্তবায়ন হওয়া।
জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, কি হবে এমপি দিয়ে? আমার মতো এক লাখ লোককে আপনি সংসদে পাঠিয়েও সিস্টেমের পরিবর্তন করতে পারবেন না। জুলাই আন্দোলনকারীরা সিস্টেম পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছে, কিন্তু সেই সিস্টেম পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হবে কেবলমাত্র গণভোট বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তিনি আরও বলেন, মানুষ হিসেবে আমি প্রশংসা শুনতে পছন্দ করি, কিন্তু কাজ করার জন্য আমি সমালোচনা শুনতে পছন্দ করি। এজন্যই সমালোচনা পছন্দ করি, কারণ সমালোচনার মাধ্যমে সুন্দরভাবে কাজ সম্পন্ন করা যায়।
ড. মাসুদ বলেন, গত ১৭ বছর ‘উন্নয়ন, উন্নয়ন, উন্নয়ন’ শুনতে শুনতে আমাদের মধ্যে কোনো ভোট নেই। ভোটের সময় মানুষ চা খায়, ঘুরে বেড়ায়, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি দিয়ে আমাদের ভোটকেন্দ্র দখল হয়ে যায়। এরপর হঠাৎ আমরা দেড় বছর কী শুনলাম—বিচার ও সংস্কার। এসব বলতে বলতে আবার উন্নয়নের কথা। উন্নয়ন বলতে বলতে বিচার ও সংস্কার আমাদের মাথা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। বিচার নেই, সংস্কার নেই, ভোটও নেই—যেনতেন একটি নির্বাচন হলেই হবে। এটি একেবারে বাস্তবতা। মন্ত্রী বলছেন। প্রধানমন্ত্রী যখন এর বিরোধিতা করেন না, তখন বুঝতে হবে এতে তারও সায় আছে এবং তার অনুমতি নিয়েই এসব কথা বলা হচ্ছে—যে আমরা কোনো রকম একটি নির্বাচন করার জন্য যা ইচ্ছা তাই করতে বাধ্য হয়েছি এবং চোখ বন্ধ করে করেছি। একজন মন্ত্রী যখন এভাবে কথা বলেন, তখন বোঝা যায়—জুলাই আর তাদের প্রয়োজন নেই, গণভোটও তাদের প্রয়োজন নেই।
জুলাই যোদ্ধাদেরকে ইঙ্গিত করে ড. মাসুদ এমপি বলেন, আপনাদের এতদিন পরে আমি কেন ডেকেছি? কারণ এতদিন মনে হয়নি, আমাদের কাছ থেকে কেউ জুলাই হাইজ্যাক করে নিয়ে যাবে। কেউ কেউ আমাদের কাছ থেকে জুলাইকে মুছে দিতে চাচ্ছে। আপনারা জানেন কিনা জানি না—এই সেদিন ভোট দেওয়ার সময় জুলাই পরিবারকে দরজায় তালা দিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে আমি গিয়ে তাদের প্রশাসনের সহায়তায় উদ্ধার করেছি। আমাদের মূল অস্তিত্ব যখন হারিয়ে যাবে, আমাদের পায়ের নিচে যখন ভিত্তি থাকবে না, তখন আমাদের অবস্থান কোথায় থাকবে? আজ সেই ভিত্তি নিয়ে টান পড়েছে। এই কারণেই আজ আপনাদের সঙ্গে বসার প্রয়োজন মনে করেছি। এটা নয় যে আমরা বিপদে পড়েছি—বিপদে পড়েছে রাষ্ট্র। আমরা সারাদেশে চেষ্টা করেছি জুলাইয়ে যারা সংগ্রাম করেছে, তাদের পাশে থাকতে। আমার উপজেলার প্রতিটি শহীদ পরিবারকে ২ লাখ করে টাকা দেওয়া হয়েছে। আহতদের এককালীনসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হয়েছে। আগামীতেও জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের যেকোনো প্রয়োজনে আমি এবং আমার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থাকবে, ইনশাআল্লাহ। জুলাই হাইজ্যাককারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাউফল উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন পটুয়াখালী জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আতিকুর রহমান, বাউফল উপজেলা ছাত্রশিবির সভাপতি আরিফুর রহমান এবং উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মো. আব্দুল্লাহ, জুলাই যোদ্ধা ফাতেমা জামান সামিয়া, তুহিন ফরাজি, বাউফল উপজেলা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক মো. রুহুল আমিন, জুলাই শহীদ সাংবাদিক মেহেদী হাসানের বাবা মোশারেরফ হোসাইন প্রমুখ।
মন্তব্য করুন