প্রকাশিত: ৩৩ মিনিট আগে, ০৭:৪৪ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ঢাকায় তিন দিনে ৫ স্থানে তাণ্ডব, নেপথ্যে চুক্তিভিত্তিক গ্যাং

টাকার বিনিময়ে চুক্তিতে জমি দখল ও ছিনতাই করেন তারা। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন মোহাম্মদপুরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতরা। চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের একটি প্লটে তাণ্ডবের ঘটনায় মো. লিমন ও মো. মনোয়ার হোসেন সাদ্দাম নামের ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

রাজধানী ও এর আশপাশে গত তিন দিনে বেশকিছু হামলা ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। অন্তত পাঁচটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে চারটি মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর ও মানিকদীতে। অন্যটি সাভারের আশুলিয়ায়।

১৯৭৪ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের হাজার হাজার নারী ও শিশুর ভরসার জায়গা ছিল মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সেখানে তাণ্ডব চালায় ২০০ থেকে ২৫০ জনের একদল দুর্বৃত্ত। ওষুধ ও টিকার মতো বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মালামাল লুটে নেয় তারা। লুটপাট শেষে বুলডোজার ও এক্সকাভেটর দিয়ে পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেয়। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

শুধু হাসপাতাল নয়, আবাসিক ভবন, হাউজিংয়ের প্লট ও নির্মাণ প্রকল্প, স্টুডিও, এবং দুটি মাদ্রাসাও তাণ্ডব চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত তিন দিনের এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাড্ডার ঘটনায় ইতিমধ্যেই শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একাধিক ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা ও বিলম্বের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

রাড্ডার ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবের সময় কাছেই ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। তাদের সামনেই স্থাপনাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। পুরো ঘটনায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে পুলিশ। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পরে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। মামলা হয় ঢাকা উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়াসহ ২০০-২৫০ জনের বিরুদ্ধে। এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) আকতার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রাড্ডার ঘটনায় কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।’

অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়ে লুটপাট চালিয়েছে। পেছনে ছিল একটাই শক্তি, রাজনৈতিক পেশিশক্তি। উদ্দেশ্যও একটাই, জমি দখল। আর অত্র এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব জেনেও নিষ্ক্রিয় ছিল।’

মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে ১৫০ থেকে ২০০ জনের একটি দল হামলা চালায় গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে। তারা ৩৫ কাঠার একটি প্লটের টিনের বেষ্টনী ভেঙে ভেতরে ঢোকে। এরপর অফিসে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।

এ ঘটনায় পুলিশ মো. লিমন ও মো. মনোয়ার হোসেন সাদ্দাম নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অর্থের বিনিময়ে চুক্তির ভিত্তিতে ছিনতাই ও জমি দখলের কথা স্বীকার করেছেন তারা।

আদাবরে ‘বাসায় থাকিস, টাকা দিবি না’ বলেই বাড়ির ফটকে কোপানো শুরু
আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে ব্যবসায়ী আমিনুর রহমানের আটতলা ভবনেও শনিবার হামলা হয়। রামদা, চাপাতি ও পিস্তল নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত ভবনের ফটক ও সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে। হামলার সময় বলা হয়, ‘টাকা দে, না হয় বাড়ি ছাড়।’

ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেড় বছর একটি চক্র বাড়িটি দখল করে রেখেছিল। আদালতের রায়ে গত ১২ মার্চ তারা দখল ফিরে পান। এরপর চক্রটি চাঁদা দাবি করে। না দেওয়ায় ফের বাড়িটি দখলের চেষ্টা চালায়।

চাঁদ উদ্যান ও শ্যামলীর দুই ঘটনাতেই ৯৯৯-এ ফোন করেন ভুক্তভোগীরা। তবে তাদের দাবি, ফোন করার তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

ইসিবি চত্বরের মানিকদী এলাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের একটি প্রকল্পে হামলা হয় শনিবার রাতে। ২০০-২৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল সেখানে গিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় নির্মাণশ্রমিকদের মারধর করা হয়। লুটে নেওয়া হয় ১৬টি মোবাইল ও প্রায় তিন কোটি টাকার মালামাল।

হামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’ পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। সালমান প্রথমে হামলার পেছনে চাঁদা দাবির কথা জানান। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনার কারণ জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ।

নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী শাহরিয়ারসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন-নর্থ) মো. মাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘চাঁদা দাবির কোনো তথ্য আমাদের কাছে এই মুহূর্তে নেই। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এটা জমিকে কেন্দ্র করে বিবদমান গ্রুপের মধ্যে হতে পারে। যথাযথ তদন্ত হলে বিস্তারিত জানতে পারব।’

সালমান মুক্তাদিরের অফিসে ভাঙচুরের ঘটনায় ৩ জনের পরিচয় প্রকাশ

সাভারের আশুলিয়ার শ্রীপুরে অবস্থিত তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাজিল মাদ্রাসা ও আশিয়া আশরাফ মহিলা মাদ্রাসায় রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। অর্ধশতাধিক অস্ত্রধারী ভেতরে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। তারা সিসি ক্যামেরার কন্ট্রোল ইউনিট, কম্পিউটার এবং লকার ভেঙে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লুট করে।

পরিচালনা পর্ষদ ও ট্রাস্টের সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা একজোট হয়ে যৌথভাবে এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন।

রাড্ডা, চাঁদ উদ্যান ও মানিকদীর ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাড্ডার ঘটনায় ৯ জন, চাঁদ উদ্যানের ঘটনায় ২ জন এবং মানিকদীর ঘটনায় ৪ জন।

আশুলিয়ায় মাদ্রাসা ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র হামলা-ভাঙচুর
এসব ঘটনায় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সাধারণ মানুষ। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও একই দৃশ্য দেখা গেল। এবার সংঘবদ্ধ আরেকটি গোষ্ঠীর নিশানা ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কারণ সেই একই, জমি দখল। প্রশ্ন হলো, এবারও কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় ছিল, নাকি তৎপর হওয়ার সদিচ্ছাই ছিল না?’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শত শত মানুষের সামনে অর্ধশত বছর ধরে দরিদ্র ও অসহায় মা-শিশুদের বিনামূল্যে সেবা দিয়ে আসা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে হামলা ও দখল প্রচেষ্টা হয়েছে। রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা একটি দলের নেতাকর্মীদের এমন আচরণ জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।

টিআইবি বলছে, বিগত সরকারের পতনের পর থেকেই বাস টার্মিনাল, হাটবাজার, বালুমহাল, জলমহাল, কেবল ও ইন্টারনেট ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে একশ্রেণির নেতাকর্মীদের মধ্যে বেপরোয়া দখলবাজি ও চাঁদাবাজির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এ ধরনের সংস্কৃতির কারণে অপরাধ কমছে না। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা কোনো নতুন বিষয় না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটা সবসময়ই কমবেশি থাকে। তবে অনেক সময় ইলেকশনের পর নতুন সরকার এলে প্রকোপটা একটু বেড়ে যায়। সরকার নতুন দায়িত্ব নিয়েছে। এখনও তারা প্রশাসনিকভাবে সঠিক লোকজনকে সঠিক জায়গায় স্থাপন পুরোপুরি করতে পারেনি। একধরনের দীর্ঘমেয়াদি বাজে অবস্থার মধ্য দিয়ে দেশ গেছে। ফলে প্রচুর লোকজন যুক্ত আছে, যারা মূলত সুবিধাভোগী। এদের বেশিরভাগই সব আমলে সুবিধা নেয়। তাই যে কোনো রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, নিজেদের স্বার্থে এই গোষ্ঠীটা নেমে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের এখানে খুব ভালোভাবে নজর রাখা উচিত। যারা ক্ষমতায় আছে এটা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের দায়িত্ব। নাগরিক হিসেবে চাইব যেন দ্রুত এই জায়গাটাতে নজর দেওয়া হয়। দোষীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয় এবং সেটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তাহলে যারা এই ধরনের সুযোগগুলো খুঁজছে তারা কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে।’

ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পুলিশের বিলম্ব এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে ডিএমপি কোনো তদন্ত করছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) আকতার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে তদন্ত অনেকভাবে হয়। মৌখিক নির্দেশে হয়। আবার অনেক সময় ফরমাল কমিটি গঠন করে তদন্ত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৌখিক নির্দেশে তদন্ত হয়েছে। কারণ একটা থানায় যখন ঘটনা ঘটে এটা মনিটরিংয়ের জন্য এসি আছে, ডিসি আছে। তারা তদন্ত করে। এটা অনেকটা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। প্রত্যেক ঘটনাতেই তদন্ত হয়।’

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তারা নিজেরা তদন্ত করেছেন মৌখিক নির্দেশে। তদন্ত ছাড়া একটি অভিযোগও থাকে না। প্রত্যেকটি ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য করুন